প্রতিবেদক: বিডিএস булবুল আহমেদ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরে এক নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে পথচলার ইঙ্গিত থাকলেও, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত আলাদাভাবে পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জোটের প্রধান দুই শরিক—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দুই দলেরই পৃথক প্রার্থী ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের আগাম প্রস্তুতি জোটের ভেতর মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় কৌশল নিয়ে জামায়াত ও এনসিপির শীর্ষ নেতারা তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন:
মাওলানা এটিএম মাছুম (সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াত): তিনি স্পষ্টভাবে জানান, "জোট গঠন করা হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের জন্য, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য নয়। তাছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই দলগতভাবেই আমরা অংশ নেব।"
ড. হামিদুর রহমান আযাদ (১১ দলীয় লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক): তিনি উল্লেখ করেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন জোটে হবে না, এককভাবেই হবে। তবে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় প্রেক্ষাপট ও প্রার্থী বুঝে সমঝোতা হতে পারে, যা কেন্দ্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
আখতার হোসেন এমপি (সদস্য সচিব, এনসিপি): তিনি বলেন, "এখন পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত হলো এনসিপি এককভাবেই স্থানীয় নির্বাচন করবে এবং সেই লক্ষ্যেই প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে যদি জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার মতো কোনো বোঝাপড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেজন্য আমরা আলোচনার দুয়ার উন্মুক্ত রেখেছি।"
মনিরা শারমিন (যুগ্ম আহ্বায়ক, এনসিপি): তিনি দাবি করেন, সারা দেশে এনসিপির জোয়ার বইছে এবং জামায়াত ও এনসিপি উভয় দলই একক নির্বাচনের পথে এগিয়ে নিজেদের সক্ষমতা জোরদার করছে।
দুই শীর্ষ শরিকের এককভাবে নির্বাচনের এই প্রস্তুতি জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবনার জন্ম দিয়েছে:
আল্লামা মামুনুল হক (আমির, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস): তিনি জোটগতভাবে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, "যেহেতু আমরা জোটে আছি, সেহেতু জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ১১ দলের পক্ষে একক প্রার্থী দেওয়া উচিত।"
ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান (চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ লেবার পার্টি): তিনি জামায়াত ও এনসিপির কৌশলকে সমর্থন করে বলেন, "স্থানীয় নির্বাচন যার যার অবস্থান থেকে এককভাবেই করা উচিত। এতে সব দল মাঠপর্যায়ে তাদের প্রকৃত সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ পাবে।"
এলডিপি ও খেলাফত মজলিসের অন্য নেতারা জানান, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জোটে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বা যৌথ আলোচনা হয়নি, তবে প্রার্থীরা নিজ নিজ উদ্যোগে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে বা এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নির্ভরযোগ্য সূত্র মতে, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এই ঘোষণার পর থেকেই মাঠের প্রস্তুতিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে এনসিপি ও জামায়াত:
এনসিপি: ইতিমধ্যেই গত ১০ মে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে (উপজেলা ও পৌরসভা)। আগামী ২৫ মে-র মধ্যে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
জামায়াতে ইসলামী: আনুষ্ঠানিকভাবে তালিকা প্রকাশ না করলেও সারা দেশে সব পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম অভ্যন্তরীণভাবে চূড়ান্ত করে মাঠে নামিয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে এই কৌশলগত মেরুকরণ ১৯০০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের স্থানীয় শাসন ও জোট রাজনীতির বিবর্তনের একটি চমৎকার ধারাবাহিকতা প্রদর্শন করে।
বিংশ শতাব্দীর শুরু ও লোকাল সেলফ-গভর্নমেন্ট (১৯০০-১৯১৯): ১৯০০ সালের দিকে লর্ড রিপনের ‘লোকাল সেলফ-গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট’ (১৮৮৫)-এর অধীনে এই অঞ্চলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ ঘটছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পরবর্তী সময়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড বা লোকাল বোর্ডের নির্বাচনগুলো দলীয় ভিত্তিতে হতো না, বরং ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে হতো। ১৯০০ সালের সেই অরাজনৈতিক স্থানীয় শাসনের রূপটিই ২০ extraction২৬ সালে ‘নির্দলীয় বা প্রতীকহীন’ নির্বাচনের মোড়কে ফিরে আসছে।
স্বাধীনোত্তর জোট রাজনীতি ও স্থানীয় সরকার (১৯৭১-১৯৯০): আশির দশকে এরশাদ সরকারের আমলে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নতুন মাত্রা পায়। তখন থেকেই জাতীয় রাজনীতির জোট ও আদর্শগত সমীকরণগুলো স্থানীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তবে দলগুলো সবসময়ই স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি ধরে রাখতে এককভাবে লড়ার কৌশল পছন্দ করত।
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব ও ২০২৬-এর নতুন ফ্রন্ট: ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে ১১ দলীয় জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, তা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ফ্রন্ট। ২০২৬ সালের এই মে মাসে এসে দেখা যাচ্ছে, জোটের দলগুলো জাতীয় স্বার্থে এক হলেও স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের ‘ভোট ব্যাংক’ এবং জনসমর্থন পরীক্ষা করতে আলাদাভাবে লড়তে চাইছে, যা এক ধরণের পরিপক্ক গণতান্ত্রিক চর্চা।
২০২৬-এর বর্তমান বাস্তবতা: ১৯০০ সালের সীমিত ভোটাধিকারের আমল থেকে ২০ Anglican২৬ সালের সর্বজনীন ভোটাধিকারের যুগে এসে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনেক বেশি প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এনসিপির মতো নতুন উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি এবং জামায়াতের মতো সুসংগঠিত দলের এই আলাদা কৌশল প্রমাণ করে যে, ২০২৬ সালের শেষের দিকের নির্বাচনটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর রাজনীতিতে ক্ষমতার এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করবে।
ইতিহাস সাক্ষী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সবসময়ই মাঠপর্যায়ে দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও নতুন নেতৃত্ব তৈরির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ১৯০০ সালের সেই ঔপনিবেশিক তদারকি ব্যবস্থা থেকে ২০২৬ সালের এই স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত স্থানীয় সরকারের রূপান্তর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১১ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে এই ভিন্ন কৌশল মূলত জোটের ফাটল নয়, বরং নিজ নিজ দলের অস্তিত্ব ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের একটি রাজনৈতিক কৌশল। জামায়াত ও এনসিপি যদি এককভাবে বিপুল সংখ্যক প্রার্থী জয়ী করে আনতে পারে, তবে ২০২৬ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জোটের ভেতর তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে।
সূত্র: ১. জামায়াত, এনসিপি এবং ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাৎকার ও যুগান্তর পত্রিকার প্রতিবেদন (১৬ মে, ২০২৬)। ২. ঐতিহাসিক দলিল: বিংশ শতাব্দীতে বাংলায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশ ও নির্বাচনী ইতিহাস (১৯০০-২০২৬)।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |